ফিতনার দিনে হিদায়াতের ওপর অবিচলতা

কয়েক দিন আগে এক বোনের বার্তা এলো। হৃদয়বিদারক একটি বার্তা। বার্তায় লেখা কথাগুলো অনেকটা এরকম ছিল:

‘আমার স্বামী জীবনের শুরুর দিকে অনেক পরহেজগার ব্যক্তি ছিলেন। বিয়ের পর আমি তাকে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করতে দেখেছি, একাধিকবার হজ্জ করতে দেখেছি। সর্বত্র সুন্নাতের পাবন্দী করতেন। মানুষকে দ্বীনের পথে আহ্বান করতেন। আমার দেখা সবচেয়ে ধার্মিক মানুষ ছিলেন তিনি। অনুপ্রেরণার কেন্দ্রস্থল ছিলেন আমাদের সবার।
কিন্তু আচানক একদিন কী থেকে কী হলো, ফেসবুকের একটি পেইজের পোস্ট পড়া শুরু করলেন তিনি। সে থেকে তার সালাত ছোটা শুরু হলো। এভাবে একে একে দ্বীনের সবগুলো স্তম্ভ ধ্বসে পড়তে থাকল। যে মানুষটির মুখে এতকাল আল্লাহ রাসূলের কথা শুনতাম, সেই মানুষটিই এখন কুফরী বাক্য উচ্চারণ করেন। ঘটাও করে কথা ও কাজ দ্বারা প্রতিনিয়ত দ্বীন-ত্যাগের ঘোষণা দেন তিনি। আমাদের ছোট ছোট দুই সন্তান রয়েছে। তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি খুব শঙ্কিত।’

ম্যাসেজটি পড়ে একটি কথা খুব ভালো-ভাবে অনুধাবন করতে পেরেছিলাম, সত্যিই, হিদায়াতের পর সবচেয়ে বড় নেয়ামত হচ্ছে ইস্তিকমাত, দ্বীনের ওপর অবিচলতা। এজন্য শায়খুল-ইসলাম ইবনু তাইমিয়াহ রহ. বলেন, ‘নিশ্চয়ই মুমিনের জীবনে সবচেয়ে বড় কারামত আমৃত্যু হিদায়াতের ওপর অবিচল থাকা।’ [মাদারিজুস-সালিকীন, ২/১০৫]

উক্তিটি শায়খুল ইসলাম (রহ.) করেছিলেন আজ থেকে প্রায় সাত শত বছর পূর্বে। এর মাঝে পেরিয়ে গেছে বহু যুগ, এসেছে নিত্য নতুন ফিতনাহ। আজ ফিতনাহ রাস্তার অলিতে গলিতে থাকে, মার্কেট থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও মেলে, ঘরের চার দেয়ালেও এর থেকে মুক্তি মেলে না। ফিতনাকে আজ পরানো হয়েছে সম্মানের পোশাক এবং ফিতনাগ্রস্ত ব্যক্তিকে বসানো হয়েছে সম্মানের আসনে। এরকম কঠিন ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়ে এক নিমেষের জন্য আমাদের ঈমান ফিতনার কালো অন্ধকার থেকে নিরাপদ হতে পারে না। আমরা সকলে ফিতনার অথৈ সাগরে ভাসছি। পরিবর্তনশীল অন্তর আরও লাগামহীন হয়ে পড়েছে এই সাগরে নেমে।

একদিন উম্মু সালামাহ (রাযি.) নবীজিকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আল্লাহর রাসূল, অন্তর কি পরিবর্তন হয়?’ নবীজি (ﷺ) বললেন, ‘হ্যাঁ, আল্লাহর গোটা সৃষ্টির ভিতর আদম সন্তানদের সকল অন্তর তাঁর দুই আঙ্গুলের মাঝে রয়েছে। যাকে চান, তার অন্তরকে আল্লাহ (হিদায়াতের পথে) প্রতিষ্ঠিত করেন। এবং যাকে চান, বিপথগামী করেন।’ [আহমাদ ২৬৫৭৬; তিরমিযী ৩৫২২; হাসান: আলবানী, ২০৯১]

আরেক হাদীসে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেন, ‘তোমরা অন্ধকার রাতের টুকরোর মতো ফিতনা আসার পূর্বে আমল দ্রুত করে ফেলো। মানুষ সে সময়ে সকালে মুমিন থাকবে এবং সন্ধ্যায় কাফের হয়ে যাবে। নিজের দ্বীনকে দুনিয়ার সম্পদের বিনিময়ে বিক্রয় করে দেবে।’ [মুসলিম (১১৮), তিরমিযী (২১৯৫)]

দ্বীনের ওপর অবিচল থাকতে যেমন আল্লাহর তাওফীক প্রয়োজন, তেমনি আমাদেরও বেশ কিছু দায়িত্ব রয়েছে। শত কোটি মানুষের ভিতর আপনি এমন একজন সৌভাগ্যবান ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ তাআলা না চাইতে মুসলিম ঘরে জন্ম দিয়েছেন, না চাইতে মুসলিম করে বড় করেছেনে এবং হিদায়াতের দিশা দিয়েছেন, না চাইতে আমলের তাওফীক দিয়েছেন। তাই হিদায়াতের মতো এত মূল্যবান সম্পদকে ধরে রাখার জন্য আমার আপনার সকলের এর প্রতি সচেতন হওয়া প্রয়োজন। হিদায়াতের পথ রোধ করে দেয়, এমন সকল ফাঁদ এড়িয়ে চলা আবশ্যক।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কীভাবে আমরা হিদায়াতের ওপর অবিচল থাকব? কীভাবে ইস্তিকমাত অর্জন করব?

(১) নিয়তের ব্যাপারে সদা সচেতন থাকুন
ওপরে আমরা একটি হাদীস পড়েছিলাম, কিয়ামতের আগে মানুষ নিজের দ্বীনকে দুনিয়ার সম্পদের বিনিময়ে বিক্রয় করে দেবে। এর অন্যতম একটি কারণ, নিয়তে অসঙ্গতি। আখিরাতের বিনিময়ে দুনিয়াবি স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্য করা। লোক দেখানো আমল-আযকার, দান-সদকা, সবকিছুতে পার্থিব স্বার্থ খোঁজা, দ্বীনের কাজকে টাকার পাল্লায় মাপা, এ ধরণের বহু দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে যা আমাদের স্বচ্ছ নিয়তকে কলুষিত করে তোলে। এগুলো থেকে বেঁচে থাকা জরুরী।

(২) আল্লাহর স্মরণে বিভোর থাকা, বেশি বেশি যিকির করা
বান্দা তার অন্তরে যত বেশি আল্লাহর বড়ত্ব, মাহাত্ম্যের অনুভূতি ধরে রাখতে পারবে, তার থেকে আত্মপ্রবঞ্চনা, আত্মতুষ্টি এবং অহংকার ততই কম প্রকাশ পাবে। হিদায়াত হতে বিচ্যুতির শুরুটা হয় শরীয়তের ওপর স্বীয় বুঝকে প্রাধান্য দেবার দ্বারা, আল্লাহ ও রাসূলের বিধানের ওপর নিজ যুক্তিকে অগ্রাধিকার দেয়ার মতো হঠকারিতা করার ফলে। তাই আল্লাহর স্মরণ দ্বারা মনকে সদা সিক্ত রাখুন, তাঁর নাম ও গুণাবলীর অনুভূতি অন্তরে জাগ্রত রাখুন।

(৩) ঈমানের হালনাগাদ করুন
হিদায়াতের শুরুটা হয় উচ্ছ্বাস দিয়ে। মনে অনেক আগ্রহ কাজ করে, আমলে অনেক উদ্যম-স্পৃহা মেলে। কিন্তু কালের পরিক্রমায় এই উচ্ছ্বাসে ভাটা পড়তে খুব সময় লাগে না। যে মানুষটি অনর্গল সালাতে দাঁড়িয়ে থাকতে পারত, তার জন্য পাঁচ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকাও তখন কষ্টকর ঠেকে। দান, সদকা, নফল ইবাদতে মন ঝাঁপিয়ে পড়ে না আগের মতো। আর এর মূল কারণ হচ্ছে, একই রুটিনে অভ্যস্ত হয়ে পড়া, কোনো উন্নতি সাধন না করা। মানুষ দুনিয়ার উন্নতির ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন হলেও আত্মীক উন্নতির ব্যাপারে ততই বেখেয়ালি। অল্প কিছু আমল করেই আমরা তৃপ্তির ঢেকুর তুলি। ফলে এক পর্যায় উচ্ছ্বাস কমার সাথে সাথে আমলগুলোও মৃত্যু হয়ে পড়ে। আর মৃত, জনমানবশূন্য ঘরে জীন শয়তানরাই বাসা বাধে। তাই ঈমানকে সদা হালনাগাদ করা জরুরী। নতুন নতুন নেক আমল এবং তাকওয়ার সচেতনতা বৃদ্ধির দ্বারা তাকে সৌন্দর্য-মণ্ডিত করুন।

(৪) জ্ঞান অর্জনকে তুচ্ছজ্ঞান না করা
সংশয়গ্রস্ত মানুষদের প্রায় সবাই কম বেশি একটি রোগে আক্রান্ত। আর তা হলো, দ্বীন ইসলাম সম্পর্কে অল্পবিস্তর জ্ঞান রাখা এবং ভুলভাবে বোঝা। ইলমে দ্বীন হলো অন্তরের নূর, আলো। যে এই আলো থেকে যত দূরে, তার অন্তর ততই অন্ধকারে নিমজ্জিত। ইসলাম ইলম ও আমলের সমষ্টি। তাই ইলমবিহীন আমল যেমন বিপদজনক, তেমনি আমল-বিহীন ইলম বিপদজনক। দ্বীনের ওপর অবিচল থাকতে দুটোই প্রয়োজন সমানভাবে। ইসলাম সবাইকে আলিম হতে বলেনি, বরং দ্বীনের মৌলিক বিষয় সম্বন্ধে জ্ঞানার্জনকে ফরজ করেছে। তাই একটি রুটিন তৈরি করুন। সেখানে ঈমান, আকীদা, সীরাত, পালনীয় আমল আযকারের ওপর কিছু জরুরী বই তালিকা করুন। অর্থ এবং সংক্ষিপ্ত তাফসীর সহ দৈনিক একটি আয়াত হলেও পড়ুন। আখিরাতের ভয় অন্তরে জাগরূক রাখতে জান্নাত জাহান্নাম এবং মৃত্যু কিছু বই রাখুন পাঠ্য তালিকায়। নবীজির সীরাহ, সাহাবীদের জীবনাচার সংক্রান্ত বইগুলো দ্বীনের ওপর ধৈর্য ধরে থাকতে, অবিচল থাকতে বেশ ফলপ্রসূ। ইলমে দ্বীন শখের বসে নয় বরং আপনার হিদায়াতের রাহে অর্জন করুন। আলিম ও তলিবদের পরামর্শ নিয়ে এমন বইগুলো বেছে নিন।

(৫) হারাম এবং কবিরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা
একজন মুমিনের পদস্খলন তখনই ঘটে যায়, যখন সে একটি কবিরা গুনাহকে তুচ্ছজ্ঞান করে। এভাবে গুনাহকে তুচ্ছজ্ঞান করার দ্বারা এক পর্যায় তার অন্তর থেকে অনুশোচনাবোধ উঠে যায়। সে তখন প্রকাশ্যে পাপটি করতে থাকে, অন্যকে উদ্বুদ্ধ করে। এমন বান্দার অন্তরে চক্ষুলজ্জা বলে কিছু থাকে না। উল্টো পাপ করতে পেরে গর্ববোধ করে। ইসলাম থেকে ছিটকে পড়ার ক্ষেত্রে এগুলো অন্যতম কারণ। কেননা একটি গুনাহকে যখন ছোট করে দেখা হয়, তখন সেটি আর ছোট গুনাহ থাকে না। বড় গুনাহে পরিণত হয়। আর বড় গুনাহকে হালাল জ্ঞান করে করতে থাকলে এক পর্যায় সেটা কুফরের স্তর তথা দ্বীন ত্যাগের মতো মারাত্মক পদস্খলন ঘটিয়ে দেয়। এজন্য হারাম এবং কবিরা গুনাহ থেকে সদা সতর্ক থাকা আমাদের সকলের জরুরী। আমরা কেউই গুনাহ মুক্ত নই, তাই তাওবাকে দৈনিক আমলে স্থান দিতে হবে। তাৎক্ষনিক গুনাহ ছাড়তে না পারলেও তাওবা পরিত্যাগ করা যাবে না।

আল্লাহ আমাদের সকলকে মেনে চলার তাওফীক দিক। আমৃত্যু হিদায়াতের ওপর অবিচল রাখুক এবং মৃত্যুর পর নেককারদের অন্তর্ভুক্ত করুক।

Add Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *